মন

দেশলাই বাক্স (মৌসুমী পাল)

#দেশলাই বাক্স।(সত্য ঘটনা অবলম্বনে—প্রধান দুই চরিত্রের নাম পরিবর্তন)#।images

পর্ব- এক

-এই ঝিলমিল ফোনটা ধরছিলিস না কেন রে?

-আসলে সাইলেন্ট এ ছিল রে বুঝতে পারিনি……

-হ্যাঁ,ওই কর! ফোন সাইলেন্ট এ দিয়ে রাখ সারাক্ষন, আর আমি সারাদিন তোকে ফোন করে যাই…. আর কি !

-ধুর, বল না কী বলবি! কথা বলার থেকে তুই আজকাল একটু বেশিই বক্তৃতা দিচ্ছিস আকাশ !

-সেই আমিই তো দি বক্তৃতা, তুই কম কী দিস শুনি! আচ্ছা শোন কাল একবার আয় না মেট্রোপ্লাজা তে….. কথা আছে তোর সাথে!

-কালই যেতে হবে! কাল আমার গানের ক্লাস আছে কী করে সময় হবে, কথা বলতে বলতেই তো সময় চলে যাবে অনেক,তখন আমার গানের ক্লাসের কী হবে শুনি!

-যা, তোকে বলে লাভ নেই!বললেও আসবি না! ছাড়,বাদ দে।

-আচ্ছা আসব নে! আসব আমি, রেগে যাচ্চিস কেন??????

-কথা দিলি কিন্তু, ভুলে যাস না যেন!

-হ্যাঁ রে আসব রে!

পর্ব- দুই

-মা,আমি বেরোবো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আকাশ তো চলে যাবে এর পর,তোমার হল রান্না!

-হ্যাঁ রে হয়েছে, খেতে বস!

 

আকাশ আর ঝিলমিল, খুব ভালো বন্ধু। সেই কলেজে ঢোকার পর ওদের বন্ধুত্ত্ব হয়। দুজনের কেউ ই একজন অন্য জনের সাথে দেখা না করে থাকতে পারে না। কেউ যদি একদিন কলেজে না আসে তাহলে অন্য জনও কলেজে আসে না! আর ভুল করে যদি চলেও আসে, তাহলে সে অন্য জনকে দেখতে না পেয়ে ফিরে যায় বাড়ি।

ওদের বন্ধুত্ত্বটা অনেকের কাছেই জ্বলুনির কারণ ছিল!কিন্তু ওরা ওদের বন্ধুত্ত্ব কখনোই নষ্ট হতে দেয়নি। একদিন আকাশ ঝিলমিলকে বলছিল——–

-জানিসইতো আমি তোকে একদিন না দেখে থাকতে পারি না, তাহলে কেন আসিস না বল তো কলেজে…….???

-কী করব! শরীর ভালো না থাকলে কী করে আসব, ভেবে দেখ আমি কত দুর থেকে আসি!

-হ্যাঁ সেটা ঠিক! কিন্তু তুই না থাকলে আমার ভালো লাগে না!

-আরে বাবা আমারও কী ভালো লাগে নাকি!

এভাবে ভালোই কাটছিল সময়। দুজনের বন্ধুত্ত্বও ছিল তালা-চাবির মতো,কিন্তু সেদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা তালার থেকে চাবিকে আলাদা করে দিল।

 

পর্ব- তিন

-কিচ্ছু হবে না তোর! আমি তো আছি! কিচ্ছু হবে না—ও দাদা একটু সাহায্য করুন না! এই হ্যালো হ্যালো! ও দাদা একটু দাঁড়ান না প্লিজ! একটু দাঁড়ান! আমার বন্ধু পড়ে আছে ওখানে! একটু হেল্প করুন না দাদা প্লিজ!

বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ঝিলমিল আকাশের হারিয়ে যাওয়া সেই সুন্দর দেশলাই বাক্সটা ব্যাগেতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। যদি ভুলে যায়! তাহলে তো আর ওটা আকাশকে ফেরৎ দেওয়া হবে না! রাস্তায় বেরিয়ে সেদিন ঝিলমিল একটাও ট্যাক্সি পেল না। সামনে একটা অটো ছিল।তাতেই উঠে পড়ল ঝিলমিল।

-জিলিপিবাগান যাবে???

-হ্যাঁ, যাবে উঠে পড়ুন।

ঝিলমিল ভাবতে ভাবতেই যাচ্ছিল আজ যখন আকাশকে ও দেশলাই বাক্সটা ফেরৎ দেবে, আকাশ তখন খুব খুশি হবে! আকাশের হাসি হাসি মুখটার কথা ভেবে ঝিলমিলের ঠোঁটের কোনে একটা সুন্দর হাসি ফুটে উঠছিল।

 

 

 

-একী কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে! হেল্প ……হেল্প….

কে আপনি ! একী কারা আপনারা ……… কী চাই আপনাদের ………ছেড়ে দিন আমাকে………অ্যা…… বাঁচাও …..অ্যা …..অ্যা ……. বাঁচাও বাঁচাও…… ছেড়ে দিন ….ছেড়ে দিন…………………………….

……..বুম………দুম ………দুম……..দুম…..।

লুটিয়ে পড়ল ঝিলমিল মাটিতে……….।

 

পর্ব- চার

-ডক্টর ডক্টর ! কী হয়েছে ঝিলমিল এর,কী হয়েছে????

-দেখুন ওকে সম্ভবত রেপড করা হয়েছে এবং তার পর গুলি করা হয়েছে। আপনি থানা তে গিয়ে একটা ডায়রি করুন। ব্যাপারটা যথেষ্ট সিরিয়াস। আর আমরা এদিকে চেষ্টা করছি! আপনি থানাতে ডায়রিটা তাড়াতাড়ি করুন………….

আকাশ বসে পড়ল নার্সিংহোম এর ফ্লোর এর উপর। চোখ দিয়ে জল পড়ছে আকাশের! ঝিলমিলকে ছাড়া ও যে থাকতে পারবে না!

অসম্ভব যন্ত্রনা হচ্ছে ওর মধ্যে এখন। হঠাৎ চোখে পড়ল আকাশের; সেই দেশলাই বাক্সটা ! ….. নার্সিংহোম এর ফ্লোর এর উপর পড়ে আছে , তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় দেশলাই বাক্সটা!

-এই যে শুনছেন, আপনাকে ডাকছি!

-হ্যাঁ ডক্টর বলুন বলুন ! হ্যা এই যে বলুন , আমি এখানে !

-আমি পারলাম না! আমায় ক্ষমা করবেন! আমি পারলাম না।

 

এরপর পাঁচটা বছর কেটে গেছে

আকাশ কাউকে ছেড়ে দেয়নি! সেদিন এর গ্যাঙ্গ রেপড এ সামিল থাকা প্রত্যেক কে ও শাস্তি দিয়েছে। শুধু একজনই ওর থেকে অনেক দুরে চলে গেছে , ঝিলমিল ! সেই দেশলাই বাক্স আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছে আকাশ। ওটাই তো দিতে চেয়েছিল ঝিলমিল আকাশকে ——–। ঝিলমিল এর ছবির সামনে আজও আছে সেই দেশলাই এর বাক্স, একটা কাঠিও নষ্ট হয়নি! সব কাঠিগুলো যত্ন করে আকাশ দেশলাই বাক্সে রেখে দিয়েছে; আজও তীরা কাঁদে ঝিলমিল এর ফিরে আসার অপেক্ষায়……… সেদিন ঝিলমিল এর ছোঁয়াতেই যে ওরা প্রাণ পেয়েছিল!

 

 

(এটা লেখার উদ্দেশ্য একটাই, এখনও এই সমাজে কোথায় মেয়েদের সুরক্ষা! কোথায় সমাজে নারী সচেতনতা! খবরের কাগজের পাতা খুললেই চোখে পড়ে নানারকম রেপ কেসের ঘটনা…… কোথায় কতদূর এগিয়েছে আজ নারী সুরক্ষা????? সমাজ শিক্ষিত হলেও আজ বহু শিক্ষিত মানুষই এই সব রেপ কেসের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। কোথায় তাদের শাস্তি? সবাই তো পায় না শাস্তি , নিজেদের আখেরটা তারা ঠিক নিজেরা গুছিয়ে নেয় একসময়।

নারী প্রগতি এগোলেও নারী সুরক্ষা এখনও মান্ধাতার আমলের পুরনো প্রতিশ্রুতি। তাই চাই নারী সুরক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলে এগিয়ে আসুক, সকলে মিলে দিক নারীকে যোগ্য সন্মান ।)

——–সমাপ্ত——-

 

 

 

2 thoughts on “দেশলাই বাক্স (মৌসুমী পাল)

    1. lokjon er valolagar jonno e lekha ! jodi ki6u manush jage ai lekha pore tahole at least somaj tak ki6uta change kora jete pare durnitir haat theke …

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s